সমুদ্রশহর কক্সবাজারের দক্ষিণে বৃক্ষশোভিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এ সড়কের দুই পাশে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে সারি সারি ঝাউগাছ। তবে সড়কটির একটি অংশে এই সৌন্দর্য আর থাকছে না। সড়ক সম্প্রসারণের কারণে কাটা পড়ছে সাড়ে ৬ হাজার গাছ।
মেরিন ড্রাইভ সড়কটি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৭৯ কিলোমিটার। কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত এ সড়কের ৩২ কিলোমিটার অংশ সম্প্রসারণ করে চার লেন করা হচ্ছে। এতে সড়কের দুই পাশে থাকা এসব গাছ কাটা পড়ছে। অবশ্য সড়কের কাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় ৩৮ হাজার গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। সড়কটি সম্প্রসারণ করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি)।
মেরিন ড্রাইভ সড়কটি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৭৯ কিলোমিটার। কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত এ সড়কের ৩২ কিলোমিটার অংশ সম্প্রসারণ করে চার লেন করা হচ্ছে। এতে সড়কের দুই পাশে থাকা এসব গাছ কাটা পড়ছে।
গত রোববার সকালে সরেজমিনে মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি ও দরিয়ানগর অংশে দেখা যায় এখানে বেশ কিছু ঝাউগাছ বাছাই (কাটার উদ্দেশ্যে দাগ দিয়ে রাখা) করে রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, কোথাও কাটা গাছ ফেলে রাখা হয়েছে। এসব গাছের বয়স ১৫ বছরের কাছাকাছি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মেরিন ড্রাইভ সড়কের কলাতলী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সড়কটি প্রস্থে ৫ দশমিক ৫ মিটার (১৮.৪ ফিট)। ৩২ কিলোমিটার অংশ সম্প্রসারণ করে ১০ দশমিক ৩ মিটার (৩৩.৭৯ ফিট) করা হচ্ছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা।
‘নির্মাণের সময় সড়কটিকে এমনভাবে করা দরকার ছিল, যাতে আর সম্প্রসারণের দরকার না পড়ে।’
১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়কটি উদ্বোধন করা হয় ২০১৭ সালে। তখনো সহস্রাধিক গাছ কাটা পড়ে। এ প্রকল্পে গাছ কাটার অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। তারা বলতে পারবে।
এ ব্যাপারে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তাদের সব প্রকল্পে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যানালিসিস করা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এটা নিয়ে সভা হয়েছে। এর প্রেক্ষাপট ধরে এটি রিঅ্যালাইনমেন্ট (পুনর্বিন্যাস) করা হয়েছে। এখানে আড়াই শর মতো গাছ কাটা পড়েছে। ইতিমধ্যে ৭০ হাজারের মতো বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।
৪ হাজার গাছ কাটা হয়ে গেছে
সড়ক সম্প্রসারণে ইতিমধ্যে গাছ কাটা হয়েছে ৪ হাজারের অধিক। বাকি গাছগুলোও অপসারণের জন্য মার্কিং করা হয়েছে। এসব গাছ কাটা হচ্ছে কক্সবাজার সদর, ধোয়াপালং ও ইনানী এলাকায়। সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪ হাজার গাছ কাটা পড়ছে কক্সবাজার সদর অংশে। ২ হাজারের মতো গাছ কাটা পড়ছে ইনানীতে। উখিয়া এলাকায় কাটা পড়ছে ৫ শতাধিক গাছ।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা–২০২৩ অনুযায়ী, সড়ক নির্মাণ প্রকল্প ১০ কিলোমিটারের বেশি হলে সেটা লাল ক্যাটাগরিভুক্ত প্রকল্প। কোনো প্রকল্প লাল ক্যাটাগরির হলে সেটার জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করতে হয়। মেরিন ড্রাইভ সম্প্রসারণ প্রকল্পটির কোনো সমীক্ষা হয়নি বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো. শামীম।
বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। অন্যদিকে আগের বছরে একই গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত কাটা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ গাছ।
সর্বশেষ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ মাসে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে খুলনা জেলায়, ৮৫ হাজার। এরপর রয়েছে লক্ষ্মীপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর। কম গাছ কাটা পড়েছে শেরপুর, খাগড়াছড়ি ও সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকায় কাটা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২৯৬টি গাছ।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নিলে ৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়ে যায়। এতে কাটা পড়ে অজস্র গাছ। এ ছাড়া বন বিভাগের তথ্যে দোহাজারী–কক্সবাজার রেল প্রকল্পে চট্টগ্রামের ও কক্সবাজারের সংরক্ষিত বন থেকে কাটা পড়েছে ৬ লাখ ৬৯ হাজার ছোট–বড় গাছ।
বন–অভয়ারণ্য, পাহাড়, সমুদ্র সব মিলিয়ে কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি অন্যতম পরিবেশ বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এখানে পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া হাজার হাজার গাছ কেটে সড়ক সম্প্রসারণ করা হলে তা হবে খুবই খারাপ নজির।পরিবেশ আন্দোলনবিষয়ক সংগঠন ধরার (ধরিত্রী রক্ষায় আমরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল
এর বাইরে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে বন বিভাগের নোটিফাইড ১০ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন থেকে কাটা হয় ছোট–বড় ৫১ লাখ গাছ।
২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ২৬তম জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে বন উজাড়করণ শূন্যতে নিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ আন্দোলনবিষয়ক সংগঠন ধরার (ধরিত্রী রক্ষায় আমরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল প্রথম আলোকে বলেন, বন–অভয়ারণ্য, পাহাড়, সমুদ্র সব মিলিয়ে কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি অন্যতম পরিবেশ বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এখানে পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া হাজার হাজার গাছ কেটে সড়ক সম্প্রসারণ করা হলে তা হবে খুবই খারাপ নজির।
মেরিন ড্রাইভ সড়কটি নির্মাণের সময়ও অনেক পাহাড়, গাছ কাটা হয়েছিল উল্লেখ করে শরীফ জামিল বলেন, তখনই সড়কটিকে এমনভাবে করা দরকার ছিল, যাতে আর সম্প্রসারণের দরকার না পড়ে। কয়েক বছর পরপর সড়ক সম্প্রসারণ হবে আর এভাবে গাছ কাটা পড়বে, সেটা অগ্রহণযোগ্য।
No comments:
Post a Comment
Thank you for your response